মঞ্চে কিংবা পর্দায় শিল্পী বিশেষ চরিত্রে কাজ করেন, নেপথ্যে নিঃশব্দে কাজ করেন মেকআপ আর্টিস্ট বা রূপসজ্জা শিল্পীরা। আলো-ঝলমলে সেই আয়োজনের আড়ালে থাকা এ শিল্পীদের অনেকেই যাপন করেন মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্তের জীবন। তবুও অন্যের মুখে শিল্প নির্মাণ করেই তারা আনন্দ পান। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শখের বশে কিংবা শিল্পের নেশায় আসা এ মানুষগুলোর কারও পথচলা বংশপরম্পরায়, আবার কেউ শিল্পের টানে এসেছেন। এ কাজের স্বীকৃতি পেয়েছেন কেউ কেউ। তবে স্বীকৃতি না পেয়েও অনেকে অসংখ্য নাচ, থিয়েটার, টিভি নাটক তথা সিনেমায় অবদান রেখে চলেছেন। তাদের জীবনের গল্প, প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির হিসাবে না গিয়ে শিল্পের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাক এমনটাই প্রত্যাশা তাদের।
* টিকে থাকার চেষ্টা
তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন মেকআপ আর্টিস্ট মোহাম্মদ আলী বাবুল। ১৯৭২-৭৩ সালের দিকে চলচ্চিত্রের মেকআপ আর্টিস্ট শহীদ আলীর হাত ধরে মেকআপের জগতে আসেন তিনি। এরপর অসংখ্য চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। স্বীকৃতি হিসাবে তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন-চাষী নজরুল ইসলামের ওরা ১১ জন, নাসির উদ্দীন ইউসুফের ‘গেরিলা’ ও গাজী রাকায়েতের ‘মৃত্তিকা মায়া’ সিনেমায়। বাবুল জানান, বর্তমানে উইগ তৈরি ও বিক্রি, থিয়েটার, ওয়েব সিরিজ, টেলিফিল্ম ও ইউটিউবের বিভিন্ন কাজে যুক্ত আছেন। তবে আগের তুলনায় এখন কাজ অনেক কম বলে জানান তিনি। এ মেকাপ আর্টিস্ট বলেন, ‘কখনো ইউটিউবের কাজ পাই, কখনো নাটকের কাজ করি, আবার উইগ তৈরি ও বিক্রি করি। এভাবেই জীবন চলছে।’
বাবুল জানান, তিনি ‘আরণ্যক’ নাট্যদলের সঙ্গেও যুক্ত। এছাড়া বিভিন্ন থিয়েটারের দলে মেকআপ আর্টিস্ট হিসাবে কাজ করছেন।
* মেকআপের সঙ্গে শিক্ষাটাও জরুরি
প্রায় পাঁচ দশক ধরে মেকআপ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শঙ্কর কুমার দাস। ১৯৭৭ সালে ঢাকায় এসে নাটক দেখা ও থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার এ অঙ্গনে পথচলা শুরু। থিয়েটারের পাশাপাশি অসংখ্য ধারাবাহিক ও একক নাটক এবং চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। তার সর্বশেষ চলচ্চিত্রের কাজ ছিল হৃদি হকের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমায়। বর্তমানে তিনি টেলিভিশনে নিয়মিত মেকআপের কাজ করছেন। এ মেকআপ আর্টিস্ট জানান, তার পরিবারের কেউ এ পেশায় ছিলেন না। তার ছেলেও মেকআপের পেশায় আসেননি; অনলাইন এডিটিং, ক্যামেরা, গ্রাফিক্সসহ অন্য বিষয়ে কাজ করছেন। নতুন প্রজন্মের যারা মেকআপ শিল্পে আসতে চান, তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ইচ্ছা থাকলে এ পেশায় আসা যায়। তবে মেকআপের কাজের পাশাপাশি পড়াশোনা ও শিক্ষাটাও জরুরি। শিক্ষার অভাবে আমাদের পেশাটি পিছিয়ে পড়েছে। সম্মান পাওয়ার জন্য নিজেরও সেই যোগ্যতা তৈরি করতে হবে।’
* আমি চাই না পরবর্তী প্রজন্ম আসুক
মেকআপ আর্টিস্ট জনি সেনের এ অঙ্গনে পথচলা শুরু আশির দশকে। চলচ্চিত্রের মেকআপ শিল্পী বাবুলের কাছে কাজ শেখার পর মঞ্চ ও নৃত্যশিল্পীদের সাজসজ্জার কাজ শুরু করেন। পরে কৃতী সরকার, কালাম পীরসহ বিভিন্ন শিল্পীর সঙ্গে কাজ করে ধীরে ধীরে নিজেই মেকআপ আর্টিস্ট হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হন। জনি সেন বলেন, ‘শুরুতে কাজ করে দিনে ২০ টাকা পেতাম। পরে ধীরে ধীরে ৫০, ৭৫, ১৫০ টাকা হয়েছে। এভাবেই কাজ শিখতে শিখতে নিজের মেকআপ তৈরি করেছি।’ বর্তমানে তিনি বিভিন্ন নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মঞ্চনাটক ও নৃত্যানুষ্ঠানে মেকআপের কাজ করেন। ‘থিয়েটার ফ্যাক্টরি’, ‘অনুস্বর’সহ বিভিন্ন দলের নাটকে কাজ করেছেন। চলচ্চিত্রেও সহকারী হিসাবে কাজ করেছেন। তবে বর্তমানে চলচ্চিত্রে কাজের সুযোগ অনেক কমে গেছে। মেকআপ শিল্পীদের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আমাদের মূল্যায়ন নেই। ভারতে দলের সঙ্গে গিয়ে কাজ করার সময় শিল্পীদের আলাদাভাবে সম্মান জানানো হয়, উত্তরীয় পরিয়ে দেওয়া হয়। সেটাই আমাদের জন্য বড় সম্মান।’
* বংশপরম্পরায় রূপসজ্জার সঙ্গে তন্ময়ের পথচলা
পারিবারিকভাবেই রূপসজ্জার সঙ্গে তন্ময়ের সম্পৃক্ততা। তার ঠাকুরদা সুরেশ দত্ত ছিলেন এ অঞ্চলের প্রথমদিকের রূপসজ্জা শিল্পী। তার বাবা ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের থিয়েটারের অন্যতম প্রধান রূপসজ্জা শিল্পী, যাকে রূপসজ্জাকরদের গুরু বলা হয়। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে বাবার হাত ধরে তাকে সহযোগিতা করার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন নাটকের রূপসজ্জার কাজে যুক্ত হন তন্ময়। ২০০০ সালে বাবার মৃত্যুর পর তার ভেতর দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। বিভিন্ন থিয়েটার দল তাকে বাবার শূন্যস্থান পূরণের দায়িত্ব দেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে চলেছেন। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার নাট্যদলের প্রযোজনা, শিশু-কিশোর নাটকসহ প্রায় এক হাজারের বেশি প্রযোজনায় রূপসজ্জা করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। থিয়েটারের রূপসজ্জায় প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে তন্ময় জানান, গ্ল্যামার মেকআপ নিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও থিয়েটারের রূপসজ্জা নিয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণের সুযোগ নেই। তাই গত ১২ বছর ধরে বাবার মৃত্যুদিবসকে কেন্দ্র করে নিজ উদ্যোগে তিন দিনের রূপসজ্জা কর্মশালার আয়োজন করছেন।
* পেটের দায়ে নয়, ভালো লাগা থেকে কাজ করা
জাহাঙ্গীর আলম প্রায় দুই দশক ধরে মেকআপ আর্টিস্ট হিসাবে কাজ করছেন। জন্মস্থান লালমনিরহাটে থাকা অবস্থায় থিয়েটারে যুক্ত হন। পরবর্তীতে ঢাকায় এসে বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণ নিয়ে মেক-আপ আর্টিস্ট হিসাবে কাজ শুরু করেন। তিনি থিয়েটার, টেলিভিশন ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে মেকআপের কাজ করে চরেছেন। যদিও পেশা হিসাবে দাঁড়ায়নি এ শিল্প, তবু এ কাজ করেই তার জীবন চলে। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি একা একটা মানুষ। আমার একটা পেট চালাতে বেশি আয়ের দরকার হয় না। কোনো রকম চলে যাচ্ছে আমার জীবন।’ তিনি আরও বলেন, ‘থিয়েটার, মিডিয়া-সব জায়গাতেই কাজ করি। তবে থিয়েটারে বেশি কাজ করা হয়। এখন এ কাজের ওপরই পুরোপুরি নির্ভরশীল আমি।’