
পৃথিবীর ইতিহাসে কিছু কিছু আগমন কেবল একজন মানুষের জন্মকে নির্দেশ করে না; তা হয়ে ওঠে একটি যুগের প্রতীক, একটি দর্শনের সূচনা, একটি নতুন আশার জন্ম। শ্রীকৃষ্ণের জন্ম তেমনই এক অনন্য ঘটনা। তাই জন্মাষ্টমী শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি অন্যায়ের অন্ধকারে ন্যায়ের আলো জ¦ালানোর, হিংসার পৃথিবীতে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার এবং মানুষের অন্তরে মানবিকতার পুনর্জন্ম ঘটানোর এক চিরন্তন আহ্বান।
দ্বাপর যুগের মথুরা তখন অত্যাচার ও ভয়ের নগরী। কংসের নিষ্ঠুর শাসনে মানুষের জীবন বিপন্ন। ক্ষমতার দম্ভে সত্য স্তব্ধ, ন্যায় অবরুদ্ধ। সেই অন্ধকার সময়ে কারাগারের বন্দিদশায় জন্ম নিলেন কৃষ্ণ। তাঁর জন্মের সঙ্গে সঙ্গে যেন একটি প্রতীকী বার্তা উচ্চারিত হলো অন্যায় যত প্রবলই হোক, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শক্তি একদিন জন্ম নেবেই। অন্ধকার কখনো আলোর চূড়ান্ত পরিণতি হতে পারে না।
আজ হাজার হাজার বছর পরও পৃথিবীর বাস্তবতা খুব বেশি বদলায়নি। প্রযুক্তি আমাদের হাতে অভূতপূর্ব ক্ষমতা দিয়েছে, মানুষ মহাকাশ জয় করেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের চিন্তার জগতে নতুন দিগন্ত খুলেছে; কিন্তু মানুষের ভেতরের হিংসা, লোভ, অহংকার ও আধিপত্যের বাসনা এখনো অনেক ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত। পৃথিবীর কোথাও যুদ্ধ, কোথাও ধর্মীয় বিদ্বেষ, কোথাও জাতিগত সংঘাত, কোথাও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা সব মিলিয়ে শান্তি আজও মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় আকাঙ্খা গুলোর একটি। এই বাস্তবতায় জন্মাষ্টমীর তাৎপর্য আরও গভীর হয়ে ওঠে।
কৃষ্ণের জীবন আমাদের শেখায়, শান্তি মানে অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ নয়। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কখনো কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতেও হয়। তিনি যেমন ভালোবাসার প্রতীক, তেমনি ন্যায় প্রতিষ্ঠারও প্রতীক। তাঁর বাঁশিতে যেমন প্রেমের সুর, তেমনি কুরুক্ষেত্রে তাঁর বাণীতে রয়েছে কর্তব্যের কঠিন শিক্ষা।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রাক্কালে অর্জুন যখন আত্মীয়-স্বজনের প্রতি মমতা ও কর্তব্যের দ্বন্দ্বে বিচলিত, তখন কৃষ্ণ তাকে যে শিক্ষা দিয়েছিলেন, তার আবেদন কোনো নির্দিষ্ট সময় বা ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের জীবনে যখন সত্য ও সুবিধা, কর্তব্য ও স্বার্থ, ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে সংঘাত তৈরি হয়, তখন কৃষ্ণের দর্শন আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করতে শেখায় আমি কোন পক্ষের?
আজকের সমাজেও এই প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা অনেক সময় অন্যায়ের প্রতিবাদ করি না, কারণ অন্যায়টি আমার বিরুদ্ধে নয়। দুর্নীতি দেখি, কিন্তু নীরব থাকি। বৈষম্য দেখি, পাশ কাটিয়ে যাই। দুর্বল মানুষের অধিকার হরণ হতে দেখি, কিন্তু নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে মুখ বন্ধ রাখি। অথচ অন্যায়ের প্রতি নীরবতাও এক ধরনের অন্যায়ের সহযোগিতা। কৃষ্ণের শিক্ষা আমাদের সেই নীরবতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেয়।
জন্মাষ্টমীর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই এ উৎসব আমাদের বাইরে নয়, ভেতরের দিকে তাকাতে শেখায়। কংস শুধু কোনো পুরাণের চরিত্র নন; মানুষের ভেতরের লোভ, নিষ্ঠুরতা, ক্ষমতার অহংকার ও প্রতিহিংসাও একেকজন কংস। আবার কৃষ্ণও কেবল মন্দিরের বিগ্রহে সীমাবদ্ধ নন; সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, অন্যের দুঃখ অনুভব করা, ভালোবাসা ও ন্যায়ের পথে চলার মধ্যেই কৃষ্ণের চেতনার প্রকাশ।
তাই আজ যখন আমরা জন্মাষ্টমী পালন করব, তখন শুধু মন্দির সাজানো, পূজা-অর্চনা, উপবাস কিংবা শোভাযাত্রার মধ্যেই যেন উৎসবের সীমা না থাকে। উৎসবের সত্যিকারের অর্থ তখনই পূর্ণ হবে, যখন আমাদের আচরণে তার প্রতিফলন ঘটবে। প্রতিবেশীর ধর্ম, বর্ণ বা পরিচয় নয়, মানুষ হিসেবে তার মর্যাদাকে আমরা সম্মান করব। ভিন্ন মতকে শত্রু মনে করব না। দুর্বলকে আঘাত নয়, শক্ত হাতে তার পাশে দাঁড়াব।
শান্তির পৃথিবী গড়তে বড় কোনো অলৌকিক ঘটনার অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। প্রত্যেক মানুষ যদি নিজের ভেতরের হিংসাকে একটু কমাতে পারে, ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসাকে বেছে নিতে পারে, অন্যের অধিকারকে নিজের অধিকারের মতো সম্মান করতে পারে, তাহলেই পৃথিবী বদলাতে শুরু করবে।
শ্রীকৃষ্ণের জন্ম তাই অতীতের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি প্রতিদিনের মানবজীবনে সত্য ও ন্যায়ের পুনর্জন্মের প্রতীক। যে মুহূর্তে একজন মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, একজন শক্তিমান দুর্বলের অধিকার রক্ষা করে, একজন মানুষ ঘৃণার জবাবে ভালোবাসা বেছে নেয় সেই মুহূর্তেই যেন কৃষ্ণের জন্ম হয় নতুন করে।
আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন অস্ত্রের শক্তি নয়, বিবেকের শক্তি; প্রতিহিংসা নয়, সহমর্মিতা; বিভাজন নয়, সম্প্রীতি। জন্মাষ্টমী সেই মানবিক শক্তির কথাই মনে করিয়ে দেয়।
কারাগারের অন্ধকারে কৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল, কিন্তু তাঁর বার্তা ছিল মুক্তির। সেই মুক্তি কেবল একটি জাতি বা সম্প্রদায়ের নয় অন্যায়, ভয়, ঘৃণা ও অমানবিকতা থেকে সমগ্র মানবজাতির মুক্তি।
তাই জন্মাষ্টমীতে আমাদের প্রার্থনা হোক পৃথিবীর প্রতিটি যুদ্ধ থামুক, মানুষের হৃদয় থেকে ঘৃণা মুছে যাক, ধর্মের নামে বিভাজন নয়, ধর্মের মহত্তর শিক্ষা মানুষকে কাছে টেনে নিক। প্রতিটি ঘরে শান্তি, প্রতিটি শিশুর মুখে হাসি এবং প্রতিটি মানুষের জীবনে মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হোক।
লেখক : প্রধান শিক্ষক, সেওজগাতি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, শালিখা।
প্রকাশ : এ্যাড.মোল্লা মহব্বত আলী, সম্পাদক মোল্লা আশিকুর রহমান ( জিতু )। অফিস : বায়াতুল আবেদ ভবন ১৫/৫ তলা,পল্টন,ঢাকা ১০০০
dainiksomoysangbad.com