মোঃ তারিকুল ইসলাম :
ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনকে জলদস্যু ও বনদস্যুমুক্ত করে নিরাপদ রাখতে র্যাবের ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবে ৫টি সক্রিয় জলদস্যু বাহিনীর ৫৯ সদস্য আত্মসমর্পণ করেছে। একই সময়ে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় চিরুনি অভিযান চালিয়ে ৫৯টি অস্ত্র, ৫৪১ রাউন্ড তাজা গুলি ও ১৪টি খালি কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে।
৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে সুন্দরবনে সক্রিয় পাঁচটি জলদস্যু বাহিনীর মোট ৫৯ জন সদস্য র্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। আত্মসমর্পণকারী বাহিনীগুলোর মধ্যে বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ১৬ জন, আনারুল বাহিনীর ১৩ জন, আফজাল ওরফে দুলাভাই বাহিনীর ১৫ জন, আফতাব বাহিনীর ৮ জন এবং মিজান বাহিনীর ৭ জন সদস্য রয়েছেন।
র্যাবের মহাপরিচালক মহোদয়ের বক্তব্যে বলা হয়, আশির দশক থেকে সুন্দরবন ও সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় জলদস্যুতা ও বনদস্যুতার কারণে জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালসহ সুন্দরবননির্ভর মানুষেরা দীর্ঘদিন ধরে জিম্মি, নির্যাতন ও অবৈধ চাঁদাবাজির শিকার হয়ে আসছিলেন। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশে মেহনতি মানুষের ওপর এ ধরনের অন্যায় ও ভয়ভীতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সুন্দরবনের জলদস্যু ও বনদস্যু দমনে র্যাব, কোস্ট গার্ড, স্থানীয় প্রশাসন, নৌ-পুলিশ ও বন বিভাগের সমন্বয়ে ‘অপারেশন রি-স্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ পরিচালিত হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে গত ২ মার্চ ২০২৬ থেকে র্যাব ফোর্সেস দস্যুমুক্ত ও নিরাপদ সুন্দরবন নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক অভিযান শুরু করে। র্যাবের এসব অভিযানের পাশাপাশি অপরাধের অনিশ্চিত জীবন থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ পেয়ে বিভিন্ন দস্যু বাহিনীর সদস্যরা আত্মসমর্পণের আগ্রহ প্রকাশ করেন।
আত্মসমর্পণকারীদের বিষয়ে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে যথাসময়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
এদিকে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে গত তিন দিনে কয়েকটি চিরুনি অভিযান পরিচালনা করে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে র্যাব। উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ৪টি শর্টগান, ৪৭টি ওয়ান শুটারগান, ৪টি পাইপগান, ৩টি এয়ারগান ও ১টি পয়েন্ট-২২ বোর রাইফেল। এছাড়া ৭টি ওয়াকিটকি, ৫৪১ রাউন্ড তাজা গুলি এবং ১৪টি খালি কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে।
র্যাব মহাপরিচালক বলেন, সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর প্রজনন ও বিচরণ নির্বিঘ্ন রাখা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস পর্যটক ও বনজীবীদের সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর থেকে প্রযোজ্য বিধিবিধান ও অনুমতি সাপেক্ষে সুন্দরবন পর্যটক ও বনজীবীদের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত হয়েছে।
সুন্দরবন উন্মুক্ত হওয়ার ঠিক আগের দিন পাঁচটি জলদস্যু বাহিনীর ৫৯ সদস্যের আত্মসমর্পণ বনজীবীদের নিরাপদে জীবিকা নির্বাহ, পর্যটকদের নিরাপদ চলাচল এবং সুন্দরবনকেন্দ্রিক স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।
ব্রিফিংয়ে মহাপরিচালক সুন্দরবনে এখনও যারা দস্যুতার সঙ্গে জড়িত তাদের অপরাধের পথ ছেড়ে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আত্মসমর্পণকারীদের সর্বোচ্চ সহায়তা দেওয়ার জন্য র্যাব সচেষ্ট থাকবে। তবে কেউ দস্যুতার অপরাধ অব্যাহত রাখলে তাকে কঠোরতম আইনগত ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত রাখা এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মেহনতি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে র্যাবের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত থাকবে। সুন্দরবনের নিরাপত্তা, বনজীবীদের জীবন-জীবিকার সুরক্ষা এবং দেশের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে র্যাব সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

