মোঃ আবু বকর সিদ্দিক,
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলার সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নে ৩৩৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের নতুন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ৯ নম্বর জেটিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘মোংলা বন্দরের সুবিধাদি সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন’ শীর্ষক এ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি। চার বছর মেয়াদি প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বন্দরে দুটি আধুনিক জেটি নির্মাণের পাশাপাশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বছরে চার লাখ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা অর্জনের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রথম স্মার্ট বন্দর হিসেবে মোংলাকে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকস কার্যক্রম সম্প্রসারণ, বন্দরের আধুনিকায়ন এবং কনটেইনার পরিবহনের সক্ষমতা বাড়াতে এ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ১০ ও ১১ নম্বর জেটি নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি কনটেইনার লোডিং-আনলোডিং ইয়ার্ড, বিপজ্জনক পণ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক ইয়ার্ড এবং প্রয়োজনীয় ৪৯টি যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হবে।
প্রকল্পের প্রধান অঙ্গ হিসেবে ৩৬৮ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৪০ মিটার প্রস্থের জেটি নির্মাণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে একসঙ্গে দুটি ২০ হাজার ডিডব্লিউটি ধারণক্ষমতার জাহাজ অথবা একটি ৫০ হাজার ডিডব্লিউটি ধারণক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানো যাবে। প্রকল্পের মোট আয়তন ২ লাখ ২৭ হাজার বর্গমিটার। এর মধ্যে লোডেড কনটেইনার ইয়ার্ড ৮৭ হাজার ৬০০ বর্গমিটার, খালি কনটেইনার ইয়ার্ড ৩৪ হাজার ১৭০ বর্গমিটার, বিপজ্জনক কনটেইনার ইয়ার্ড ৪ হাজার ২৬০ বর্গমিটার, অভ্যন্তরীণ সড়ক ৫০ হাজার ৪০০ বর্গমিটার, প্রশাসনিক ভবন ২ হাজার ৫১৭ বর্গমিটার এবং কনটেইনার ফ্রেইট স্টেশন (সিএফএস) ৩ হাজার ৯০৯ বর্গমিটার।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা প্রতি ঘণ্টায় ৩০ টিইইউতে উন্নীত হবে। বার্ষিক চার লাখ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা অর্জিত হবে। এতে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ব্যয় কমার পাশাপাশি নিরাপদে কনটেইনার সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা তৈরি হবে। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে বিনিয়োগ কার্যক্রম সহজীকরণেও প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে।
ইতোমধ্যে মোংলা বন্দরে বহুমাত্রিক পরিবহন সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর ফলে তৈরি পোশাকশিল্প, নিটওয়্যার, খাদ্যপণ্য, পাটকল ও শিপিং খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী পৃথক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পটির পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রক্রিয়া। ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর চীনের রাষ্ট্রপতির বাংলাদেশ সফরকালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তিতে প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরে ২০২১ সালের ২৬ আগস্ট চীনা অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় জি-টু-জি পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চীনা প্রতিষ্ঠান সিসিইসিসির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন করে। একই বছরের ২৫ মার্চ মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিসিইসিসির মধ্যে বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
প্রকল্পের অর্থায়নের বিষয়ে ২০২৬ সালের ২৫ জুন চীন সফরকালে চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি (সিআইডিসিএ) এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মধ্যে ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ১০ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকার ও চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ হাজার ৫৯২ কোটি ৯০ লাখ টাকার সমপরিমাণ ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরে জাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এ অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ, বৃহৎ অবকাঠামো ও শিল্প উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ সম্প্রসারণেও প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে। আধুনিক বন্দর অবকাঠামোর সঙ্গে প্রস্তাবিত চীনা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সমন্বয়ে মোংলাকে সামুদ্রিক বাণিজ্য, শিল্প বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক লজিস্টিকস কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান, বন, পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদিন ফারুক, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, নৌপরিবহন সচিব মো. আতাউর রহমান খানসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও আমদানি-রপ্তানিসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
চীনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সিসিআরসিসির চেয়ারম্যান দাই হেগেন, বাংলাদেশে চীনা দূতাবাসের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কাউন্সেলর সং ইয়াং এবং সিসিইসিসির চেয়ারম্যান লি চংইয়াং। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা।
অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলের কাছে একটি বৃক্ষরোপণ করেন। পরে প্রকল্পের বাস্তবায়নসহ দেশ ও জাতির সার্বিক উন্নয়ন কামনায় দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।#