সুন্দরবনসহ উপকূলীয় অঞ্চলে এবার কেওড়া ফলের বাম্পার ফলন হয়েছে। নদীর চর, বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকা ও লবণাক্ত জমিতে বেড়ে ওঠা কেওড়া গাছগুলোতে থোকায় থোকায় ফল ধরেছে। সুন্দরবনসংলগ্ন খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের বিভিন্ন এলাকায় এখন কেওড়া সংগ্রহ ও বিক্রির ব্যস্ততা দেখা যাচ্ছে।
উপকূলের মানুষের কাছে কেওড়া শুধু একটি ফল নয়, এটি খাদ্য ও আয়েরও একটি সম্ভাবনাময় উৎস। টক স্বাদের এই ফল দিয়ে আচার, চাটনি, জ্যাম ও জেলি তৈরি করা যায়। আবার ছোট চিংড়ি মাছ ও মসুর ডালের সঙ্গে কেওড়া রান্না উপকূলীয় এলাকার মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
পাইকগাছা উপজেলার বিভিন্ন নদীর চরভরাটি জমিতে গত কয়েক বছরে সামাজিক বনায়নের আওতায় কেওড়া গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। শিবসা, ভদ্রা, মিনহাজ, কপিলিয়া ও কপোতাক্ষ নদের চরাঞ্চল ছাড়াও বিভিন্ন সুইচগেট ও নদীর তীরবর্তী এলাকায় প্রাকৃতিকভাবেও কেওড়া গাছ জন্মেছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব গাছের বেশির ভাগই এখন ফলন দেওয়ার উপযোগী হয়েছে। গাছের ডালে ডালে ফল ধরায় স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি বাজারে বিক্রির জন্যও কেওড়া সংগ্রহ করছেন।
কেওড়া একটি দ্রুতবর্ধনশীল ও লবণাক্ততা সহিষ্ণু গাছ। উপকূলীয় পরিবেশে তুলনামূলক কম পরিচর্যায় এটি বেড়ে ওঠে এবং গাছে প্রচুর ফল ধরে। ফাগুনের শেষ দিকে ফুল আসার পর চৈত্র থেকে ফল পাওয়া শুরু হয়। মৌসুমভেদে ভাদ্র-আশ্বিন মাস পর্যন্ত কেওড়া পাওয়া যায়।
স্থানীয় বাজারগুলোতে মৌসুমে প্রতি কেজি কেওড়া ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হয়। দাম তুলনামূলক কম হলেও সহজলভ্য এই ফল সংগ্রহ ও বিক্রি করে অনেক পরিবার বাড়তি আয় করছে।
বাতিখালি চর বনায়ন সমিতির সাধারণ সম্পাদক জামিরুল ইসলাম বলেন, অনাবাদি ও লবণাক্ত জমিতে পরিকল্পিতভাবে কেওড়ার বনায়ন করা গেলে একই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা এবং মানুষের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
উপকূলীয় এলাকার মানুষের খাদ্যসংস্কৃতিতে কেওড়ার রয়েছে বিশেষ জায়গা। কেওড়া দিয়ে তৈরি টক ও চাটনি ভাতের সঙ্গে খাওয়ার পাশাপাশি ছোট চিংড়ি ও মসুর ডালের সঙ্গে রান্না করেও খাওয়া হয়।
এ ছাড়া কেওড়া ফল প্রক্রিয়াজাত করে আচার, চাটনি, জ্যাম ও জেলি তৈরি করা সম্ভব। স্থানীয় নারীরা বাড়িতে বসেই এসব খাদ্যপণ্য তৈরি করে বাজারজাত করতে পারেন। এতে নারীদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পারিবারিক আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
কেওড়ার গুরুত্ব শুধু ফলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের ক্ষেত্রেও কেওড়া ফুলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মৌমাছি কেওড়া ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে। ফলে কেওড়া গাছের বিস্তার মধু উৎপাদনের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
একই সঙ্গে কেওড়া উপকূলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। লবণাক্ত মাটিতে টিকে থাকার সক্ষমতা এবং শ্বাসমূলের কারণে জোয়ার-ভাটাপ্রবণ এলাকায় এ গাছ সহজেই বেড়ে উঠতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কেওড়া ফলকে শুধু মৌসুমি ফল হিসেবে বিক্রি না করে পরিকল্পিতভাবে প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাত করা গেলে উপকূলীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হতে পারে।
কেওড়ার আচার, চাটনি, জ্যাম ও জেলিসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করা সম্ভব। এ জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কেওড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রশিক্ষণ এবং উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
পাইকগাছা বন কর্মকর্তা প্রবীর বিশ্বাস বলেন, পাইকগাছার বাতিখালি, হাড়িয়া, বেতবুনিয়া, জিরবুনিয়া, কাঠামারী ও দেলুটীতে প্রায় ১০০ হেক্টর নদীর চরে বনায়ন গড়ে উঠেছে। এসব বনের ৮০ শতাংশই কেওড়া গাছ। পরিকল্পিত বনায়নের মাধ্যমে কেওড়ার বিস্তার ঘটানো গেলে একদিকে যেমন উপকূলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা হবে, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের বাড়তি আয়ের পথও তৈরি হবে। ফলে কেওড়া ফলকে ঘিরে উপকূলীয় অঞ্চলে গড়ে উঠতে পারে সম্ভাবনাময় একটি ক্ষুদ্র শিল্পখাত।

