মোঃ নাইমুজ্জামান শরীফঃ
খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার পূর্ব রূপসার গুরুত্বপূর্ণ বাগমারা কাচাঁ বাজারের একটি প্রায় ১২ ফুট প্রশস্ত রাস্তা বর্তমানে বিভিন্ন দোকানের পণ্য, মালামাল ও অস্থায়ীভাবে দোকানের অংশ বাইরে বের করে রাখার কারণে সংকুচিত হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বাজারের ভেতরের এই গুরুত্বপূর্ণ পথটি দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য ক্রেতা-বিক্রেতা ও সাধারণ মানুষ চলাচল করলেও রাস্তার দুই পাশে দোকানদারদের পসরা সাজানোর কারণে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ১২ ফুট প্রশস্ত রাস্তাটির দুই পাশে অবৈধভাবে দোকানের পসরা সাজানোয় তা সংকুচিত হয়ে বর্তমানে ৬ থেকে ৭ ফুটে এসে দাঁড়িয়েছে। এতে প্রতিদিন চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন বাজারে আসা অসংখ্য ক্রেতা ও পথচারী।
সরেজমিনে বাজার এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে বিভিন্ন দোকান রয়েছে। বিশেষ করে কাঁচাবাজার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকানগুলোর সামনে বিভিন্ন ধরনের সবজি, পণ্যসামগ্রী, বস্তা, ঝুড়ি, প্লাস্টিকের ক্রেটসহ নানা মালামাল দোকানের নির্ধারিত সীমানার বাইরে রাস্তার দিকে রাখা হয়েছে। ফলে কাগজে-কলমে বা বাস্তবে যে রাস্তা প্রায় ১২ ফুট প্রশস্ত, সেটির ব্যবহারযোগ্য অংশ অনেকটাই কমে যাচ্ছে। কোনো কোনো স্থানে দুই দিক থেকে ক্রেতা-বিক্রেতা কিংবা পথচারী একসঙ্গে চলাচল করতে গেলে তৈরি হচ্ছে জটলা। বাজারে মানুষের উপস্থিতি বাড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে বলে জানান স্থানীয়রা।
রূপসা প্রেসক্লাবে সাধারণ সম্পাদক মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান তিনি বলেন,
বাগমারা বাজারটি আশপাশের এলাকার মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কেনাকাটার স্থান। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে আসেন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, মাছ, মাংস ও শাকসবজি কিনতে। বাজারের ভেতরের সরু এই রাস্তা দিয়ে একাধিক দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। কিন্তু বাজারের বিভিন্ন স্থানে দোকানের পণ্য রাস্তার ওপর পর্যন্ত চলে আসায় সাধারণ মানুষের চলাচলের জায়গা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। কোথাও দোকানের সামনে সবজির ঝুড়ি, কোথাও বস্তা, আবার কোথাও বিভিন্ন পণ্য সাময়িকভাবে রাস্তার ওপর রাখা হচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, ব্যবসা পরিচালনার জন্য দোকানের নির্ধারিত জায়গা থাকলেও রাস্তার ওপর অতিরিক্তভাবে পণ্য সাজানো বা মালামাল রাখা হলে জনসাধারণের চলাচলের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাজার করতে আসা একজন ক্রেতা মোঃ জাকারি হোসেন তিনি বলেন, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বাজারে ক্রেতাদের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি থাকে। এ সময় সরু রাস্তা দিয়ে মানুষ চলাচলের পাশাপাশি বিভিন্ন দোকানে পণ্য সরবরাহের কাজও চলতে থাকে। ফলে বাজারের ভেতরের এই রাস্তা অনেক সময় আরও ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আমরা যখন ভারি পণ্য যেমন ধরুন চালের বস্তা ধরে যখন চাল কিনি তখন ভ্যান করে নিতে হয়। কিন্ত রাস্তাটি সরু হওয়ায় ভ্যান একটি ঢুকলে অন্য আর একটি ভ্যান বেড় হতে পারে না।
বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও অসুস্থ মানুষের জন্য এ ধরনের সংকুচিত পথ দিয়ে চলাচল কষ্টসাধ্য হয়ে উঠতে পারে। বাজার করতে আসা মানুষকে অনেক সময় একে অপরকে পাশ কাটিয়ে চলাচল করতে হয়।
বাজার করতে আসা একজন মহিলা ক্রেতা তিনি বলেন, বাজারের রাস্তা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নয়। এটি সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য নির্মিত। তাই রাস্তার ব্যবহারযোগ্য অংশ সংকুচিত করে এমন কোনো কার্যক্রম চলতে দেওয়া উচিত নয়।
বাজাওে একজন টেলিকম দোকানদার মোঃ আব্দুল ওহায় বলেন, বাজারের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা দখল হয়ে সংকুচিত থাকলে জরুরি পরিস্থিতিতে বড় ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় যানবাহন প্রবেশে বাধার সৃষ্টি হতে পারে।বাজার এলাকায় দোকানপাট ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় আগুন লাগার মতো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত চলাচলের রাস্তা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাস্তার ওপর দোকানের মালামাল ও পণ্য থাকলে সেই পথ আরও সংকুচিত হয়ে যেতে পারে।
বাজার করতে আসা মোঃ সিরাজুল ইসলাম তিনি বলেন,
শুধু রাস্তা সংকুচিত হওয়াই নয়, বাজারের কোনো কোনো স্থানে ময়লা-আবর্জনা ও পণ্য পরিবহনের কারণে রাস্তার পরিবেশও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাস্তার ওপর দীর্ঘ সময় ধরে পণ্য ও অন্যান্য সামগ্রী রাখা হলে স্বাভাবিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমও ব্যাহত হতে পারে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বাজারের কিছু অংশে পানি ও কাদা জমে থাকার পাশাপাশি রাস্তার ওপর বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা ছড়িয়ে রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের চলাচলে আরও ভোগান্তির সৃষ্টি হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, একটি বাজার শুধু ব্যবসার স্থান নয়; এটি জনসাধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবাকেন্দ্র। তাই বাজারের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন ও চলাচল উপযোগী রাখা সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্ব।
বাজার করতে আসা শেখ ফরিদুল বাবু তিনি বলেন,
বাগমারা বাজারের এই গুরুত্বপূর্ণ ১২ ফুটের রাস্তা দখলমুক্ত রাখতে বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে আমি মনে করি।
এ বিষয়ে বাগমারা বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ খোকনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি রাস্তা দখলের সত্যতা নিশ্চিত করেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “রাস্তাটি মূলতঃ ১২ ফুট চওড়া। রাস্তার দুই পাশে ড্রেন রয়েছে। কিন্তু দোকানদাররা ড্রেনের ওপর এবং রাস্তার বেশ কিছুটা অংশ দখল করে নিজেদের মালামাল রাখছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে একাধিকবার তাদের মালামাল সরিয়ে রাস্তা উন্মুক্ত করার কথা বলেছি, কিন্তু তারা আমার কথার কোনো গুরুত্ব দেননি বা কর্ণপাত করেননি।”
স্থানীয়দের দাবি, বাজারের প্রতিটি দোকানকে তাদের নির্ধারিত সীমানার মধ্যে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। রাস্তার ওপর স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে পণ্য, মালামাল কিংবা দোকানের পসরা রাখা বন্ধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রথমে ব্যবসায়ীদের সচেতন করা এবং বাজারের চলাচলের রাস্তার সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া যেতে পারে। এরপরও কেউ নিয়ম না মানলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
নিময়মিত বাজার করতে আসা আর একজন ক্রেতা এড.মোল্লা মহব্বত তিনি বলেন,
বাজারের রাস্তা দখলমুক্ত করার ক্ষেত্রে শুধু প্রশাসনের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। ব্যবসায়ী, বাজার কমিটি ও সাধারণ মানুষ—সকলের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন। দোকানদাররা যদি নিজেদের ব্যবসার সুবিধার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের চলাচলের বিষয়টিও গুরুত্ব দেন, তাহলে এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান সম্ভব। কারণ বাজারের রাস্তা উন্মুক্ত ও চলাচল উপযোগী থাকলে ক্রেতাদের জন্য কেনাকাটা সহজ হবে এবং ব্যবসায়ীদেরও দীর্ঘমেয়াদে লাভ হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বাজারে আসা সাধারণ মানুষের দাবি, বাগমারা কাচাঁ বাজারের গুরুত্বপূর্ণ এই ১২ ফুটের রাস্তা দ্রুত দখলমুক্ত করে আগের মতো স্বাভাবিক চলাচলের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হোক। তাদের মতে, রাস্তার দুই পাশে দোকানের মালামাল নিয়মের মধ্যে রাখা এবং বাজারের ভেতরের রাস্তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার মাধ্যমে খুব সহজেই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। বাগমারা বাজার শুধু ব্যবসায়ীদের নয়, এটি সাধারণ মানুষেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। তাই জনসাধারণের চলাচলের পথ কোনোভাবেই সংকুচিত হওয়া উচিত নয়। এখন দেখার বিষয়, জনভোগান্তির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাগমারা কাচাঁ বাজারের এই গুরুত্বপূর্ণ ১২ ফুটের রাস্তা দখলমুক্ত ও চলাচল উপযোগী রাখতে কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

